Saturday, 19 December 2015

new Urban rode plans

আসাদুর রহমান কোনো বিজ্ঞানী বা নগর পরিকল্পনাবিদ নন, একজন সাধারণ মানুষ। সম্প্রতি তার আবিষ্কৃত যানজটমুক্ত সড়কের মডেল গৃহীত হয়েছে সরকারিভাবে। আসাদুর রহমান এবং তার স্বপ্নের সিগন্যালবিহীন সড়ক নিয়ে প্রচ্ছদ লিখেছেন ইমরান-উজ-জামান সারা ঘরে রাস্তার ম্যাপ আর সেই সব রাস্তায় প্রচুর গাড়ি। প্লাস্টিকের মডেল গাড়ি দিয়ে গাড়ি নির্দেশ করা হয়েছে। ডানে-বামে, সামনে-পেছনে বোর্ড দিয়ে বানানো রাস্তায় গাড়ি চলাচলের মডেল। ঘরের মেঝেতে বড় টেবিলের ওপর একটা বড় ম্যাপে রাখা আছে রাস্তার ছবি। এটা ঢাকা শহরের রাস্তা যানজটমুক্তকরণের মহাপরিকল্পনা। এই মডেলটির জন্যই তিনি প্রথম পুরস্কার পেয়েছেন। এ বছরের ৮-১০ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হয়ে গেল বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদের বিজ্ঞান ও শিল্প-প্রযুক্তি মেলা ২০১৫। ঢাকাকে যানজটমুক্তকরণের একটি বিজ্ঞানভিত্তিক ও কার্যকরী পরিকল্পনা প্রণয়নের জন্য স্বশিক্ষিত বিভাগে প্রথম স্থান অধিকার করেন ঢাকার জুরাইনের আসাদুর রহমান মোল্লা। উদ্ভাবনী ক্ষমতার স্বীকৃতিস্বরূপ সম্মাননার সঙ্গে ৩০ হাজার টাকাও ছিল। আসাদুর রহমান মোল্লা কোনো বিজ্ঞানী নন; একজন সাধারণ মানুষ। ঘণ্টাখানেকের আলোচনায় এটা বোঝা গেল কত কষ্টসাধ্য একটি কাজ করেছেন তিনি। নিজেই জানান সে কথা_ ঢাকা শহরের রাস্তার প্রতিটি ইঞ্চি পথ তিনি পর্যবেক্ষণ করেছেন। তার পরেই এই মডেল তৈরি করেছেন। তবে এই মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের আছে ভিন্ন একটি ইতিহাস। আসাদুর রহমান মোল্লা কাজ করেন বাংলাবাজারে। জুরাইন থেকে ইসলামপুর যেতে তার সময় লেগে যায় তিন থেকে চার ঘণ্টা। প্রতিদিন একই ঘটনা। বিরক্ত হয়ে ভাবলেন_ নাহ, এভাবে প্রতিদিন শুধু শুধু মূল্যবান কর্মঘণ্টা নষ্ট করার কোনো মানে হয় না। এ থেকে মুক্তি পেতে হবে। জ্যামে রিকশায় বসে বসেই ভাবেন। একদিনের কথা_ দয়াগঞ্জের ট্রাফিক সিগন্যালে ট্রাফিক নিজেই ঘর্মক্লান্ত হয়ে হাঁপােেচ্ছন। রিকশা থেকে নেমে গিয়ে যানবাহনের জট খোলার সহজ রাস্তাটা বাতলে দিলেন ট্রাফিককে। ট্রাফিক পুলিশ আসাদকে পরামর্শ দিলেন এই বিষয়টা তাকে না বলে কর্তাব্যক্তিদের কাছে বলতে। কারণ আসাদ যে পদ্ধতিতে গাড়ি ঘুুরাতে ও রাস্তা যানজটমুুক্ত করার কথা বলেছেন সেই পদ্ধতি বেশ সহজ, কিন্তু সিটি করপোরেশনের নিয়মের বাইরে। প্রস্তাবনা তৈরি করতে হবে। অফিসিয়ালি জমা দিতে হবে কার্যকর করতে। শুরু করলেন সারা ঢাকার রাস্তা যানজটমুক্তকরণে মহাপরিকল্পনার কাজ। পুরনো ও অভিজ্ঞ ড্রাইভার জুলফিকার আলী তাদের পারিবারিক গাড়ির চালক। সেনাবাহিনীর ভারী গাড়ি চালাতেন। দেখেই বলে দিতে পারেন রাস্তার প্রশস্ততা কতটা আছে আর কতটা প্রয়োজন। কোন রাস্তায় কোন গাড়ি ঘুুরতে পারবে। জুলফিকার আলীকে নিয়ে ঘুরে বেড়ালেন সারা ঢাকা। ঢাকার প্রতিটি পাড়া-মহল্লা ঘুরে ঘুরে তৈরি করেলেন ঢাকা ট্রান্সপোর্ট মহাপরিকল্পনা। জুলফিকার আলী বিভিন্ন বিষয়ে তথ্য ও পরামর্শ দিয়ে সহায়তা করলেন আসাদকে_ রাস্তার কোন বাঁকে ইউটার্ন নিতে গাড়ির কতটুকু জায়গার প্রয়োজন পড়বে; কোন রাস্তা কতটুকু প্রশস্ত আছে আরও কতটা হওয়া প্রয়োজন, সব দেখেশুনে সিদ্ধান্ত নিলেন। ঢাকা নগরের গাড়ির গতিপথ একমুখী করে যদি গাড়ি চলাচল নির্বিঘ্ন রাখা যায়, বাধাহীনভাবে গাড়ি চলাচল নিশ্চিত করতে পারলে নগরে কোনো যানজট থাকবে না। আর মানুষের মূল্যবান কর্মঘণ্টাও বাঁচবে। তার পরিকল্পনা মতে ঢাকার প্রতিটি পথ হয়ে যাবে একমুখী। নগরের ২ হাজার ৬০০ কিলোমিটার মূল রাস্তায় কোনো রিকশা চলাচল করবে না। সব রাস্তায় গাড়ি একদিকে চলাচল করবে। মহল্লা ও সংযোগ সড়কগুলোতে সাব-ট্রান্সপোর্ট হিসেবে রিকশা ও ছোট ছোট যান চলাচল করবে। দূরপাল্লার যানবাহনের জন্য স্ট্যান্ডগুলো নগরের বাইরে নিয়ে যেতে হবে। নগর পরিবহনের গাড়িগুলো যেখানে খুশি থেমে যাত্রী ওঠানামা করে। এতে প্রায় সময়ই যানজট লেগে যায়। এই সমস্যা দূরীকরণে তিনি গাড়িতে যে সিঁড়ি আছে তা উঠিয়ে দেওয়ার পক্ষে। তার পরিকল্পনা মতে গাড়ির সিঁড়ি উঠিয়ে দিয়ে গাড়ির স্টেশনে গাড়ির মেঝে সমান উঁচু বেদি করে দিলে চাইলেও কেউ নিদিষ্ট স্টেশন ব্যতিরেকে যত্রতত্র নামতে-উঠতে পারবে না। নগরের কিছু কিছু জায়গায় গাড়ির চলাচল একমুখীকরণের জন্য ওভারহেড ইউটার্নের ব্যবস্থা করতে হবে। সাধারণ রাস্তায় গাড়ি ইউটার্ন করাতে বিশেষ ডিজাইনের প্রয়োজন পড়বে। লক্ষণীয় বিষয় হলো, রাস্তায় আর কোনো ট্রাফিক পুলিশের প্রয়োজন পড়বে না। রাস্তার ডিজাইনমতো কেউ চাইলেই যে কোনো জায়গায় যানবাহন ঘুরাতে পারবে না। পরিকল্পিত প্রতিবন্ধকতার ফলে নির্ধারিত রাস্তায় গাড়ি চালাতে বাধ্য হবে মানুষ। অনেকের সঙ্গে কথা বললেন। পরামর্শ নিলেন অনেকের। ২০১২ সালে তার বানানো প্রস্তাবনা জমা দিলেন ডিএমপি, যোগাযোগ মন্ত্রণালয় ও তৎকালীন ঢাকা ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন বোর্ড ডিটিসিবি বর্তমান ঢাকা ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন অথিরিটি ডিটিসিএর কাছে। বুয়েটের কয়েকজন নগর পরিকল্পনাবিদ, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের প্রাক্তন চেয়ারম্যান ও নগর বিশেষজ্ঞ প্রফেসর নজরুল ইসলাম, ডিএমপির ট্রাফিক পুলিশের তৎকালীন জয়েন্ট সেক্রেটারি ব্যারিস্টার মাহবুবুল আলম একদিন ডেকে পাঠালেন আসাদুর রহমান মোল্লাকে। তার প্রবর্তিত পদ্ধতির বিভিন্ন দিক নিয়ে বিশদ আলাপ-আলোচনা করলেন। তার পরিকল্পনার প্রশংসা করলেন। তিনি জোর দিলেন এই পরিকল্পনার দুটি দিকের ওপর। প্রথমত, কোনো খরচ ছাড়া ও কম সময়ে বাস্তবায়নযোগ্য। মাহবুবুল আলম জানান, তিনি ডিএমপিতে থাকাকালীন এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে যাবেন। কিন্তু হঠাৎ তিনি বদলি হয়ে চলে গেলেন ঢাকার বাইরে। আটকে গেল তার পরিকল্পনা। তবে তার পরিকল্পনা মতে এয়ারপোর্ট থেকে প্রধানমন্ত্রীর অফিস পর্যন্ত একমুখী গাড়ি চলাচলের ঘোষণা দিয়েছিলেন যোগাযোগমন্ত্রী। পরে সেই ঘোষণাও কেন যেন আর আলোর মুখ দেখেনি। প্রথম থেকেই আসাদুর রহমান মোল্লার উদ্ভাবিত ও পরিকল্পিত যানজটমুক্ত নগর চিন্তার ভক্ত পরিবহন বিশেষজ্ঞ ড. সালেহ উদ্দীন আহমেদ। সালেহ উদ্দীন আগে থেকেই এই প্রজেক্টটি সম্পর্কে জানেন। তিনি আসাদুর রহমান মোল্লার উদ্ভাবিত পরিকল্পনাটিকে বাস্তবসম্মত ও বৈজ্ঞানিক বলে অভিহিত করলেন। ঢাকা সিটি করপোরেশনের কাছে এই প্রজেক্ট চালু করার প্রস্তাব জমা দিলেন আসাদুর রহমান মোল্লা। প্রজেক্ট জমা দেওয়ার প্রয়োজনে নিজের গাঁটের টাকা খরচ করে তৈরি করলেন ইউলুপ ডিজাইনসহ রাস্তা ডিভাইডারের পূর্ণাঙ্গ নকশা। মেয়রের নির্দেশে ডিএনসিসির প্রকৌশলীরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখলেন এবং ছোট ছোট ক্রুটি-বিচ্যুতি সমাধান করে সাতরাস্তা থেকে গাজীপুর চৌরাস্তা পর্যন্ত এই পরিকল্পনা চালু করার সিদ্ধান্ত হলো। আগামী ৬ মাসের মধ্যে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে। গত মাসের ১৮ তারিখে ঢাকার একটি হোটেলে সড়ক ও সেতুমন্ত্রীর উপস্থিতিতে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র ঘোষণা দিলেন, রাজধানীর হাতিরঝিলের সাতরাস্তা থেকে গাজীপুর চৌরাস্তা পর্যন্ত ৩০ কিলোমিটার সড়কের ৬৯টি রোড ক্রসিং বন্ধ করে ২২টি ইউ-লুপ তৈরি করে একমুখী যান চলাচল চালু হলে ঢাকার রাস্তার ২৫-৩০ শতাংশ যানজট কমে যাবে। আসাদের বয়স এখন ৪৭ বছর। নটর ডেম কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাস করে সিটি কলেজ থেকে বিএসসি করেছেন। এরপর একটি ঢেউটিন কোম্পানিতে কাজ করেছেন। কিছুদিন ছিলেন কনস্ট্রাকশন ব্যবসায়ী। এখন কাপড়ের ব্যবসা করেন। চার ভাই ও দুই বোনের মধ্যে তিনিই বড়। বাবা ছিলেন স্কুলের শিক্ষক। ১৯৯৬ সালে বাবা মারা গেলে আসাদ পরিবারের হাল ধরেন। বাবার রেখে যাওয়া জমিতে বাড়ি তুলে নিচতলার দুটি ঘর যানজট প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ করেছেন। ঘরগুলোয় ঢাকার বিভিন্ন এলাকার মানচিত্র আর যানজট নিরসনের উপায় সংবলিত ত্রিমাত্রিক মডেল শোভা পাচ্ছে। মডেল তৈরি করতে একজন আর্কিটেক্ট বন্ধুর সাহায্য নিয়েছেন। নকশাগুলোর বড় বড় প্রিন্টও করিয়েছেন, নিজের পয়সায়। গোড়ায় ভাইবোন সবাই এটিকে পাগলামি হিসেবে দেখেছিল। কিন্তু সায়েন্স ল্যাবরেটরি মেলায় পুরস্কার পেয়ে শেষ পর্যন্ত সমীহ আদায় করেছেন সবার। রাজধানীকে যানজটমুক্ত করতে ক্রমাগত স্বপ্ন দেখেন আসাদুর রহমান। সেই স্বপ্নের পালে হাওয়া লেগেছে। শুরু হয়েছে আসাদের স্বপ্নের যানজটমুক্ত সড়কের কাজ। নগরবিদদের মতে, প্রকল্পটি শেষ হলে ঢাকার যানজট নিরসনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হবে। কোনও এক নতুন ভোরে রাজধানীবাসী হয়তো দেখবে যানজটমুক্ত এক নতুন ঢাকা। হ - See more at: http://bangla.samakal.net/2015/12/19/180682#sthash.V7LJ1dpa.dpuf

No comments:

Post a Comment